Home BD Infoনাগরিক সেবা, ব্যাংকিং ও প্রযুক্তির বাংলা গাইড

গর্ভধারণ নিয়ে ১০টি প্রচলিত ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য

নতুন দম্পতিদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন আসে, কখন মিলন করলে সন্তান হয় না? এ নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা ছড়িয়ে আছে। কিছু ধারণা অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা বাড়ায়, আবার কিছু ধারণা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি তৈরি করে। এই লেখায় ১০টি প্রচলিত ভুল ধারণার সঠিক তথ্য এবং সন্তান না হলে কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন, তা জানতে পারবেন।

সংক্ষেপে: কোনো সময়ই গর্ভধারণের ঝুঁকি শতভাগ শূন্য নয়। শুধু আন্দাজ বা প্রচলিত কথার ওপর ভরসা করা নিরাপদ নয়।

গর্ভধারণ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য

কোন সময়ে সন্তান হয় না? সত্য ও ভুল ধারণা

গর্ভধারণ হতে হলে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন দরকার। ডিম্বাণু ডিম্বস্ফোটনের পর মাত্র ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকে, আর শুক্রাণু নারীর শরীরে ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই ডিম্বস্ফোটনের আগের কয়েকদিন ও ডিম্বস্ফোটনের দিনে গর্ভধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ডিম্বস্ফোটন কবে হবে, তা প্রতি মাসে বদলাতে পারে।

উর্বর দিন কীভাবে হিসাব করা যায়, তা জানতে পড়ুন গর্ভধারণ এড়াতে নিরাপদ দিন হিসাবের নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা। এবার প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দেখা যাক।

গর্ভধারণ নিয়ে ১০টি প্রচলিত ভুল ধারণা

১. "প্রথমবার মিলনে গর্ভধারণ হয় না"

বাস্তবতা: ভুল। প্রথমবার হোক বা পরে, উর্বর সময়ে মিলন হলে গর্ভধারণ হতে পারে।

২. "মাসিকের সময় গর্ভধারণ একেবারেই হয় না"

বাস্তবতা: সম্ভাবনা কম, কিন্তু শূন্য নয়। মাসিক চক্র ছোট হলে মাসিকের শেষ দিকে মিলনের পর ডিম্বস্ফোটন তাড়াতাড়ি হতে পারে। শুক্রাণু ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে বলে তখন গর্ভধারণ সম্ভব।

৩. "মাসিক শেষ হওয়ার পর প্রথম কয়েকদিন সম্পূর্ণ নিরাপদ"

বাস্তবতা: সবার ক্ষেত্রে নয়। চক্র অনিয়মিত বা ছোট হলে ডিম্বস্ফোটন আগে হতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আছে মাসিকের কতদিন পর গর্ভধারণ হয় না লেখায়।

৪. "বীর্যপাতের আগে সরে গেলে গর্ভধারণ হয় না"

বাস্তবতা: ভুল। এই পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। সাধারণ ব্যবহারে এক বছরে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে আনুমানিক ২০ জন গর্ভবতী হতে পারেন।

৫. "মিলনের পর প্রস্রাব করলে বা ধুয়ে ফেললে গর্ভধারণ ঠেকানো যায়"

বাস্তবতা: ভুল। এতে গর্ভধারণ আটকায় না।

৬. "মিলনের ভঙ্গি বা অবস্থান গর্ভধারণ ঠেকাতে পারে"

বাস্তবতা: ভুল। কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান গর্ভধারণ আটকাতে পারে না।

৭. "ক্যালেন্ডারের হিসাব শতভাগ নির্ভরযোগ্য"

বাস্তবতা: না। মানসিক চাপ, অসুস্থতা, ওজন পরিবর্তন বা ভ্রমণে ডিম্বস্ফোটন সরে যেতে পারে। তাই এই পদ্ধতির ব্যর্থতার হার তুলনামূলক বেশি।

৮. "বুকের দুধ খাওয়ালে গর্ভধারণ হয় না"

বাস্তবতা: কিছু নির্দিষ্ট শর্তে সম্ভাবনা কমে, কিন্তু নিশ্চিত নয়। মাসিক ফিরে আসার আগেই ডিম্বস্ফোটন শুরু হয়ে যেতে পারে, তাই এই সময়েও গর্ভধারণ সম্ভব। এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৯. "একবার মিলনে গর্ভধারণ হয় না"

বাস্তবতা: ভুল। উর্বর সময়ে একবারের মিলনেও গর্ভধারণ হতে পারে।

১০. "সন্তান না হলে দোষ শুধু নারীর"

বাস্তবতা: ভুল। সন্তান না হওয়ার কারণ নারী, পুরুষ বা দুজনের মধ্যেই থাকতে পারে, আবার অনেক সময় কারণ অজানা থাকে। তাই পরীক্ষা দুজনেরই করানো উচিত।

জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে কী জানবেন?

গর্ভধারণ এড়াতে চাইলে প্রচলিত কথার ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি বেছে নিন। কনডোম একই সঙ্গে যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। কোন পদ্ধতি আপনার জন্য উপযুক্ত, তা বয়স, স্বাস্থ্য ও ওষুধের ওপর নির্ভর করে। তাই চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করুন। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাধারণত পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে পরামর্শ পাওয়া যায়।

অনিরাপদ মিলনের পর গর্ভধারণ এড়াতে জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি আছে, যা যত দ্রুত সম্ভব নিতে হয়। এ বিষয়ে ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের সঙ্গে দ্রুত কথা বলুন।

মাসিক দেরি হলে মাসিক মিস হওয়ার প্রথম দিন বা তার পরে ঘরে পরীক্ষা করতে পারেন। নিয়ম জানতে পড়ুন বাসায় প্রেগন্যান্সি কিট দিয়ে গর্ভাবস্থা পরীক্ষা। ফল নিয়ে সন্দেহ হলে দেখুন পজিটিভ হলেও ভুল হয় কেন।

সন্তান নিতে চেয়েও না হলে সম্ভাব্য কারণ

নারীর দিক থেকে

  • ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা, যেমন পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) বা থাইরয়েডের সমস্যা
  • ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ থাকা
  • এন্ডোমেট্রিওসিস বা জরায়ুর ফাইব্রয়েড
  • বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিম্বাণুর মান ও সংখ্যা কমা

পুরুষের দিক থেকে

  • শুক্রাণুর সংখ্যা কম বা গতি দুর্বল হওয়া
  • শুক্রাণুর গঠনে সমস্যা
  • ভ্যারিকোসিল (অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়া)
  • ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান ও অতিরিক্ত ওজন

গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়াতে কী করবেন?

  • উর্বর সময়ে একদিন পরপর মিলিত হওয়া। প্রতিদিন মিলিত হওয়া জরুরি নয়।
  • ধূমপান ও মদ্যপান ছেড়ে দেওয়া এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত ঘুম।
  • গর্ভধারণের আগে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

  • নিয়মিত চেষ্টার পরও এক বছরের মধ্যে গর্ভধারণ না হলে। নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ৬ মাস পর।
  • মাসিক খুব অনিয়মিত, অতিরিক্ত ভারী বা তীব্র ব্যথাযুক্ত হলে।
  • মিলনের সময় ব্যথা বা অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হলে।
  • ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা অন্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

কোন সময়ে মিলন করলে গর্ভধারণ একদমই হয় না?

কোনো সময়ই শতভাগ নিশ্চিত নয়। ডিম্বস্ফোটন প্রতি মাসে একই দিনে নাও হতে পারে, তাই শুধু হিসাবের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।

মাসিকের সময় মিলন করলে কি গর্ভধারণ হতে পারে?

সম্ভাবনা কম হলেও হতে পারে, বিশেষ করে ছোট মাসিক চক্র থাকলে।

প্রথমবার মিলনে কি গর্ভধারণ হতে পারে?

হ্যাঁ, উর্বর সময়ে হলে প্রথমবারেও হতে পারে।

বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় কি গর্ভধারণ হতে পারে?

হ্যাঁ, পারে। মাসিক ফেরার আগেই ডিম্বস্ফোটন হতে পারে।

সন্তান না হলে কোন পরীক্ষা করানো উচিত?

চিকিৎসক সাধারণত স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করান। কোন পরীক্ষা লাগবে, তা চিকিৎসকই ঠিক করবেন।

শেষ কথা

গর্ভধারণ নিয়ে প্রচলিত কথার অনেকটাই ভুল বা অসম্পূর্ণ। সঠিক তথ্য জানা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই পরিকল্পিত পরিবারের সবচেয়ে নিরাপদ পথ। গর্ভধারণের লক্ষণ চিনতে পড়ুন গর্ভবতী হওয়ার প্রথম সপ্তাহের লক্ষণ।

তথ্যের ভিত্তি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও যুক্তরাষ্ট্রের CDC-র পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত সাধারণ নির্দেশিকা।

অন্যান্য ইনফো পড়ুন

সতর্কতা: এই লেখা শুধু সাধারণ ও শিক্ষামূলক তথ্যের জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসমস্যায় নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

এই লেখা সাধারণ তথ্যের জন্য। সরকারি নিয়ম, ফি ও সেবা বদলাতে পারে; স্বাস্থ্য বা আইনি বিষয়ে সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা অফিসিয়াল সূত্রে যাচাই করে নিন।

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.